প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা শুল্ক বিবাদ যুক্তরাষ্ট্রসহ শীর্ষ অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধির গতি অনেকটাই স্তিমিত করে দিয়েছে। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সংশোধন করে কমিয়ে এনেছে। যেখানে বলা হচ্ছে, প্রত্যাশা অনুযায়ী বৈশ্বিক অর্থনীতির সম্প্রসারণ হবে না। সর্বশেষ একই সতর্কবার্তা দিয়ে অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) বলেছে, শুল্ক বিবাদের কারণে কভিড মহামারী পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে দুর্বল প্রবৃদ্ধির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। খবর এফটি।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থাটি গতকাল এক পূর্বাভাসে জানিয়েছে, বৈশ্বিক উৎপাদন ও জি২০-ভুক্ত অধিকাংশ শীর্ষ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার তুলনায় কমতে পারে। এখন দেশগুলো যদি বাণিজ্য বাধা কমাতে চুক্তিতে না আসে, তাহলে বিনিয়োগে গতি ফিরবে না এবং পণ্যের দাম আরো বাড়তে পারে, যা উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদনে দেয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ ও ২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি হবে ২ দশমিক ৯ শতাংশ। কভিড-১৯ মহামারীর সময় বৈশ্বিক উৎপাদনে বড় ধরনের পতন ঘটে, তা সত্ত্বেও ২০২০ সালের পর থেকে এবারই প্রথম প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে নামতে যাচ্ছে।
বিশেষ করে মার্কিন অর্থনীতি ব্যাপক মাত্রায় শ্লথ হয়ে পড়বে। গত বছর দেশটি ২ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। এর বিপরীতে চলতি বছর প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৬ ও ২০২৬ সালে ১ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এছাড়া মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি ফেডারেল রিজার্ভকে চলতি বছরে সুদহার কমাতে বাধা দেবে বলে জানিয়েছে ওইসিডি।
ওইসিডির আগের পূর্বাভাসটি এসেছিল এপ্রিলে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্কের আগে। তখনো সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছিল, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক ও নীতিগত অনিশ্চয়তা অর্থনীতিতে ‘গুরুতর প্রভাব’ ফেলবে। অবশ্য পরবর্তী সময়ে কিছু শুল্ক থেকে আংশিকভাবে পিছু হটেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত গড় শুল্ক ২ দশমিক ৫ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশের ওপরে উঠে এসেছে। শুল্কের এ হার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ, যাকে ‘অভূতপূর্ব’ বলে উল্লেখ করেছে ওইসিডি।
প্যারিসভিত্তিক সংস্থাটি মার্চের অস্থায়ী পূর্বাভাসের তুলনায় চীন, ফ্রান্স, ভারত, জাপান, দক্ষিণ আফ্রিকা ও যুক্তরাজ্যসহ জি২০ সদস্য দেশগুলোর জন্য ২০২৫ সালের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাসে নিম্নমুখী সংশোধন করেছে।
ওইসিডির প্রধান অর্থনীতিবিদ আলভারো পেরেইরার মতে, বর্তমান অবস্থা পরিবর্তনে দেশগুলোকে দ্রুত বাণিজ্য বাধা কমিয়ে আনতে হবে। এক্ষেত্রে চুক্তি হলো সমাধান। না হলে প্রবৃদ্ধির ওপর শুল্কের প্রভাব খুবই বড় হবে। পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব পড়বে।
ওইসিডির সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ পূর্বাভাস প্রকাশ হয়েছিল গত ডিসেম্বরে। সে তুলনায় প্রায় সব দেশের প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা কমেছে বলে জানান আলভারো পেরেইরা। ওইসিডি বলেছে, ‘প্রায় কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া দুর্বলতর অর্থনৈতিক আশঙ্কার প্রভাব বিশ্বজুড়েই অনুভূত হবে।’
বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতির গতিপথ নির্ধারণ ঘিরে অনিশ্চয়তাও প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগে টানাপড়েন তৈরি করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে চীনের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপ করেছেন, আবার পরে তা কিছুটা কমিয়েছেন। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য অঞ্চলের ওপর বড় ধরনের শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। তিনি বিভিন্ন খাতে আলাদাভাবে শুল্ক নির্ধারণ করেছেন। কয়েক দিন আগেই দ্বিগুণ করে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক ৫০ শতাংশ করার ঘোষণা দিয়েছেন।
ওইসিডি জানায়, মে মাসের মাঝামাঝিতে বজায় থাকা শুল্কহার অপরিবর্তিত থাকবে ধরে নিয়ে এ পূর্বাভাস তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন একটি আদালত জানিয়েছেন, ট্রাম্প ঘোষিত রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ অবৈধ। তবে এ রায়ের বিরুদ্ধে হোয়াইট হাউজ আপিল করেছে।
এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি চলতি বছরের শেষ নাগাদ ৪ শতাংশে পৌঁছতে পারে এবং ২০২৬ সালেও এটি ফেডারেল রিজার্ভের লক্ষ্যমাত্রার ওপরে থাকতে পারে। ফলে সুদহার কমানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
মার্চের পূর্বাভাসের তুলনায় জি২০ জোটের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ সদস্য দেশের জন্য এ বছরের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস কমিয়ে এনেছে ওইসিডি। গত বছর চীনের প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ শতাংশ। সেখান থেকে কমে চলতি বছর ৪ দশমিক ৭ ও ২০২৬ সালে হবে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। ইউরোজোনে ২০২৫ সালে প্রবৃদ্ধি হবে মাত্র ১ শতাংশ ও আগামী বছর ১ দশমিক ২ শতাংশ।
জাপানের অর্থনীতি ২০২৫ ও ২০২৬ সালে যথাক্রমে দশমিক ৭ ও দশমিক ৪ শতাংশ হারে বাড়বে। যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধি হবে যথাক্রমে ১ দশমিক ৩ ও ১ শতাংশ, যা মার্চের প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৪ ও ১ দশমিক ২ শতাংশের তুলনায় কম।
অন্যদিকে বৈশ্বিক বাণিজ্য ২০২৫ সালে ২ দশমিক ৮ ও আগামী বছর ২ দশমিক ২ শতাংশ হারে বাড়বে, যা ডিসেম্বরে দেয়া পূর্বাভাসের তুলনায় অনেক কম। ওইসিডি সতর্ক করে বলেছে, বাণিজ্য উত্তেজনার পাশাপাশি রাজস্ব ঘাটতির ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ার কারণে প্রভাবিত হচ্ছে অন্যান্য খাত।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির অনিশ্চয়তা আর্থিক বাজারে নেতিবাচক প্রভাবের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। দীর্ঘ সময়ের দুর্বল বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলো মিলিয়ে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা আরো কমিয়ে দিচ্ছে। ওইসিডি বলেছে, মুনাফা বাড়লেও কোম্পানিগুলো স্থায়ী মূলধন বিনিয়োগ এড়িয়ে আর্থিক সম্পদ সঞ্চয় ও শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে অর্থ ফেরত দেয়ার দিকেই মনোযোগ দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ বাড়ানোই হবে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা অর্থনীতি পুনরুজ্জীবন ও সরকারি রাজস্ব পরিস্থিতির উন্নয়নে সহায়ক হবে।